
সারাদেশে খাল পুনঃখনন, খালের দুই পাড়ে সবুজ বনায়ন এবং নদী-খালের ভাঙন রোধের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান তৈরির একটি বড় মাপের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। একইসঙ্গে পুনঃখনন করা এসব খাল দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য লোকবল কাঠামোর একটি রূপরেখাও তৈরি করা হচ্ছে। তবে বিপুল অর্থ বরাদ্দের এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা সফল হবে, নাকি সরকারি অর্থের অপচয় বাড়াবে—তা নিয়ে পরিবেশবিদদের মধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রান্তিক অঞ্চলের অসচ্ছল মানুষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী জীবিকার সুযোগ করে দেওয়াই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। খালের পাড়ে গাছ এবং বিন্নিঘাস লাগিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে নদীভাঙন রোধের পরিকল্পনাকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে দেখা হলেও, অতীত অভিজ্ঞতার কথা বিবেচনা করে জলবায়ু ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা এতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় খাল খনন ও গাছ লাগানো হলেও সেগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছিল না। ফলে অল্প দিনেই পলি জমে খালগুলো আবার ভরাট হয়ে যায়। টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা না করে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর করের বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয় প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে প্রকৃত অসচ্ছলদের সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় নদীবিজ্ঞান ও পরিবেশ বিবেচনা না করে পলি অপসারণ করা হলে তা আশপাশের নদী ব্যবস্থার ক্ষতি করতে পারে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) নির্বাহী প্রধান মো. শামসুদ্দোহা এ প্রসঙ্গে জানান, সঠিক নীতিমালার অভাবে অনেক সময় সরকারের ভালো প্রকল্পগুলো মাঝপথে থমকে যায় এবং অর্থ অপচয় হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই কার্যক্রম সফল করতে হলে অর্থের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিতের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে যুক্ত করতে হবে এবং খননকাজে স্বচ্ছতা আনাসহ স্থানীয় জনগণকে নিয়ে জবাবদিহিমূলক কমিটি গঠন করতে হবে।
পাইলট প্রকল্পের রূপরেখা
সরকারের চলমান নদী ও খাল উদ্ধার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই পরীক্ষামূলক মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন খাল খননের পরিবর্তে উদ্ধারকৃত সরকারি খালগুলোকে পানি সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা এবং অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে টেকসই সম্পদে রূপান্তর করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
প্রথম ধাপে ৮টি বিভাগের ২০টি নির্বাচিত খাল বা খালসমষ্টি নিয়ে পরীক্ষাটি শুরু হবে, যার মোট দৈর্ঘ্য হবে ৬০ কিলোমিটার। প্রতি ১ কিলোমিটারকে একটি ইউনিটে ভাগ করে মোট ৬০টি পরিচালনা ইউনিট গঠন করা হবে। প্রতি ইউনিটে ২০ জন করে মোট ১২০০ জন উপকারভোগী যুক্ত হবেন, যার মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী সদস্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এসব খালে পরিবেশগত ক্ষতি না করে সামাজিক বনায়ন, হাঁস ও মাছ চাষ, শাকসবজি উৎপাদন এবং নৌচলাচল বজায় রাখা হবে। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির (ইজিপিপি) তালিকা, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং যাচাইকৃত অতিদরিদ্ররা সমবায়ের মাধ্যমে এ সুবিধা পাবেন।
অর্থায়ন ও সময়সীমা
দুই বছর (২৪ মাস) মেয়াদি এই পাইলট প্রকল্পের জন্য প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা সরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই অর্থ অবকাঠামো, চারাগাছ, প্রশিক্ষণ, ঘূর্ণায়মান মূলধন ও পরিবীক্ষণে ব্যয় হবে। পরবর্তীতে সমবায় ও উৎপাদিত আয়ের মাধ্যমে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার কোনো খালের মালিকানা হস্তান্তর করবে না; তবে শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার ও দেখভালের সাময়িক অনুমতি দেবে।
প্রকল্পের অগ্রগতি এবং সুফল মূল্যায়ন করতে ১২ মাসে মধ্যবর্তী এবং ২৪ মাস পর তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যালোচনা করা হবে।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, শুধুমাত্র ব্যয়ের পরিমাণ নয়, বরং কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো, কত পরিবার স্বাবলম্বী হলো, পরিবেশ কতটা সুরক্ষিত থাকল এবং নারীর অংশগ্রহণ কতটা বাড়ল—তার ওপর ভিত্তি করেই এই প্রকল্পের সফলতা পরিমাপ করা হবে। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা দলীয় প্রভাব ছাড়াই পুরো কাজটি স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে।
সরকারের চলমান পাঁচ বছর মেয়াদে দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির যে ইশতেহার রয়েছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে বেকার তরুণ ও অসচ্ছলদের কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকরা।

বিশেষ প্রতিবেদক | ভাঙাগড়া: 










