নিজস্ব প্রতিবেদন, ঢাকা │ ভাঙাগড়া
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল, উচ্ছেদ, হামলা, হুমকি ও দেশত্যাগে বাধ্য করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিস' (এইচআরসিবিএম)। সংস্থাটির সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই এ ধরনের অন্তত ২০টি ঘটনা ঘটেছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকার ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ সব তথ্য জানান এইচআরসিবিএম-এর কনভেনর অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড়।
তিনি জানান, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত তাদের সংস্থা দেশে মোট ৮২৪টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। এর মধ্যে দেশের ৫৭টি জেলায় জায়গা-জমি দখল, আক্রমণ ও লুটপাটের ২৩৪টি ঘটনা রয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসের ধারা বজায় রেখে জুলাইয়েও সংখ্যালঘুদের ওপর এ ধরনের নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এবং নীলফামারীর জলঢাকার দুটি ঘটনা বিশেষ তথ্যসহ তুলে ধরা হয়:
চুনারুঘাটে পৈতৃক জমি দখলের অভিযোগ
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাটিয়াজুরী গ্রামের বাসিন্দা রবীন্দ্র সরকার পৈতৃক জমি দখল, হামলা ও হুমকির অভিযোগে থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
এইচআরসিবিএম জানায়, দীর্ঘদিনের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে গত ৯ আগস্ট বিকেলে রবীন্দ্র সরকারের অনুপস্থিতিতে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর সীমানায় ঢুকে জমি মাপা শুরু করেন। পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে তাঁদের মারধর করা হয় এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরিবারটি বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
ভুক্তভোগীদের কাছে ঘটনার ভিডিও প্রমাণ থাকলেও প্রশাসন তা পুরোনো বা অন্য ঘটনার বলে দাবি করেছে। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছে এইচআরসিবিএম। উল্লেখ্য, এই জমি সংক্রান্ত মামলাটির রায়ের দিন আগামী ১৭ আগস্ট নির্ধারিত রয়েছে। রায়ের আগে এলাকায় নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
জলঢাকায় জমি দখল ও দেশত্যাগের হুমকি
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার মীরগঞ্জ ইউনিয়নে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের চেষ্টা, গাছপালা কেটে ফেলা এবং দেশত্যাগের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাঁদের বাঁশ ও কলাগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে বাধা দেওয়া হয় এবং এক ব্যক্তির মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার সময় প্রশাসনের লোকজন এসেও ‘মব’ সৃষ্টির ভয়ে গাড়ি থেকে নামেননি।
পরিস্থিতির আশঙ্কায় পরিবারের নারী সদস্যরা অন্যত্রে আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়া প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা ভুক্তভোগী পরিবারটিকে ৩ শতক জমি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এইচআরসিবিএম এই অভিযোগটিরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে।
আইনি অধিকার ও সুরক্ষার দাবি
সংবাদ সম্মেলনে অ্যাডভোকেট লাকী বাছাড় জোর দিয়ে বলেন, জমির মালিকানা বিরোধ আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান হতে হবে; গায়ের জোরে জমি দখল গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের প্রতিটি নাগরিকের—তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সংখ্যালঘু যাই হোন না কেন—জীবন, সম্পত্তি ও আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার সমান।
এইচআরসিবিএম এসব ঘটনার দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সুরক্ষা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির কো-অর্ডিনেটর আশিষ কুমার অঞ্জন, সিলেট বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর রাকেশ রায়, আইটি সেক্রেটারি সমীর চন্দ্র মিস্ত্রী, উপদেষ্টা অনিল পাল, অ্যাডভোকেট জিতেন্দ্র বর্মন, ঢাকা বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর অমিত বর্মন, সমাজকর্মী সুস্মিতা কর এবং হৃদয় পোদ্দার উপস্থিত ছিলেন।